মি’রাজ অর্থ: মি’রাজ শব্দটি আরবি। এর অর্থ উর্ধ্বে উঠার সিঁড়ি বা বাহন। ইসলামী পরিভাষায়, এ বিশ্ব সভার সভাপতি, নবীকুল সর্দার, নিখিল বিশ্বের রহমত, সৃষ্টিকুলের মুক্তিদূত, সরওয়ারে কায়েনাত হযরত মুস্তাফা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর এক রাতে পবিত্র মক্কা নগরী বাইতুল মুকাদ্দাসে এভাবে সপ্তাকাশ অতিক্রম করে মহান আল্লাহর সাাতে হাজির হওয়ার ঐতিহাসিক অনন্য সাধারণ ঘটনাকে মি’রাজ নামে অভিহিত করা হয়। এ বিস্ময়কর ঘটনা সম্পর্কে বিশ্ববাসী ওয়াকিবহাল। যে রাতে এ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল ঐ রাতটি বিশ্ব মুসলিম সমাজে ‘লাইলাতুল মি’রাজ’ বা শবে মি’রাজ নামে সুপরিচিত।
মি’রাজের সময় ও তারিখ
মি’রাজের এই বিশ্ববিশ্র“ত অলৌকিক ঘটনাটি কোন সময় সংঘটিত হয়েছিল সে সম্পর্কে বুখারী শরীফের অন্যতম ভাষ্যকার আল্লামা আইনী রহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেছেন, জমহুর ওলামায়ে কেরামের মতে, নবুয়্যতের দ্বাদশ সালের ২৭ রজব সশরীরে জাগ্রত অবস্থায় রাতের একাংশে তাঁর মি’রাজ সংঘটিত হয়। বিশ্বের মুসলিম সমাজের সর্বত্র এমতই সমধির সুপ্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত।
মি’রাজ বা ঊর্ধ্বজগতে পরিভ্রমণ
সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবীর (দ.) ঊর্ধ্ব জগতে পরিভ্রমণ আলোচনা করে শেষ করা কোন মানুষের পে সম্ভব নয়। যখন ইসলামের সবচেয়ে নাজুক ও সঙ্কটপূর্ণ যুগ সমাপ্ত হওয়ার পথে ছিল এবং হিজরতের পর থেকে শান্তি নিরাপ্তার এক নতুন যুগের শুভ সূচনা অত্যান্ন ছিল। তখন সে বরকতময় রাতের আগমন ঘটল এবং সে মোবারক রাতে সৌভাগ্যের সে সময় এগিয়ে আসল যা মহাশূণ্যের বাগানে বিশ্বনবীর (দ.)-এর ভ্রমণের জন্য নির্দিষ্ট ছিল যার মধ্যে আল্লাহর দরবার থেকে নির্দিষ্টআহকামের বিধিবদ্ধ হওয়া এবং তা কাজে পরিণত করার নির্দেশাবলী ছিল। তাই জান্নাতের দারোগা রিদওয়ানকে হুকুম করা হলো যেন আজ অদৃশ্য জগতের মেহমানখানাকে নতুন সাজ-সরঞ্জামে সুসজ্জিত করা হয়। আজ বিশ্ব প্রত্যকারী মেহমান হয়ে আসবেন। হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালামকে হুকুম দেয়া হলো বিদ্যুৎ থেকে দ্রুতগামী, আলো থেকে অধিক কার্যকরী উপাদানসমূহকে নির্দেশ দেয়া হলো, নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের যাবতীয় বস্তুভিত্তিক নিয়মনীতি যেন কিছুণের জন্য নিষ্ক্রিয় করে দেয়া হয় এবং স্থান-কাল ভ্রমণ একামত, দর্শন, শ্রবণ ও বাক্য বিন্যাসের সকল সহজাত নিয়মাবলী যেন উঠিয়ে নেয়া হয়।
সহীহ বুখারী ও মুসলিম হযরত আবুজার রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত আছে, বিশ্বনবী (দ.) মক্কায় ছিলেন। হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম অবতীর্ণ হলেন। প্রথমে তিনি রাসূলুল্লাহ্ (দ.)কে মিরাজের সংসংবাদ দিলেন। তারপর প্রথমে তার সীনা মোবারক চাক করলেন। তারপর ঈমান ও হেকমতপূর্ণ সোনার একটি তস্তুরী আনা হলো এবং সীনা মোবারকে সংস্থাপন করা হলো। অতঃপর হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম উভয় জগতের সুলতান (দ.)কে সশরীরে বুরাকের ওপর আরোহন করে মসজিদুল হারাম থেকে বাইতুল আক্সা বা বাইতুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত ভ্রমণ করিয়েছিলেন। বাইতুল মুকাদ্দাসে অবতরণের পর সেখানে সমবেত নবীগণের (আলায়হিমুস্ সালাম) জামা‘আতে ইমামতি ও নামায আদায় করেন। নামায আদায়ের সময় বুরাককে মসজিদের দরজায় কড়ায় বেঁধে রাখা হয়েছিল। নামায আদায়ের পর পুনরায় তাকে বুরাকে আরোহন করিয়ে পৃথিবীর নিকটতম আসমানে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রথম আসমানে দরজা খোলা হলে সেখানে মানুষের আদিপিতা হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম-এর সঙ্গে রাসূলুল্লাহ্-এর সাাৎ হয়। হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম তার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, ইনি হচ্ছেন আপনার আদিপিতা হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম। সালাম ও শুভেচ্ছা বিনিময় হলো। হযরত আদম আলায়হিস্ আবেগ-আপ্লুত কণ্ঠে খোশ আমদেদ, হে আমার বংশের মধ্যমণি খোশ আমদেদ। হে আমার বংশের গৌরব অতঃপর তিনি তার নব্যুয়াতের স্বীকারোক্তি করলেন এবং ডানদিকে আল্লাহর নেককার বান্দাগণের এবং বামদিকে বদকার বান্দাগণের আত্মাসমূহ তাকে প্রদর্শন করালেন।
এরপর তাকে দ্বিতীয় আসমানে নিয়ে যাওয়া হয়। দরজা খোলা হলে সেখানে হযরত ইয়াহইয়া বিন যাকারিয়া এবং হযরত ঈসা বিন মরিয়ম আলায়হিস্ সালাম-এর সঙ্গে তার সাাৎ হয়। তারপর তৃতীয় আসমানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ইউসুফ আলায়হিস্ সালাম সঙ্গে সাাৎ হলে তিনি তাকে শ্রদ্ধাভরে সালাম জানান। তিনিও সালামের জবাব দিয়ে তাকে মোবারক বাদ জানান এবং তার নবুওয়াতের স্বীকারোক্তি করেন। এভাবে চতুর্থ আসমানে হযরত ইদরীস আলায়হিস্ সালাম-এর সঙ্গে সাাৎ হলো। পঞ্চম আসমানে হযরত হারুন আলায়হিস্ সালামকে দেখতে পান। যথারীতি পরস্পর মোবারক বাদ জানান। ষষ্ঠ আসমানে হযরত মূসা আলায়হিস্ সালাম-এর সঙ্গে সাাৎ হয়। কুশলাদি বিনিময় হল।
অগ্রযাত্রার পরবর্তী পর্যায়ে সকল নবী রাসূলদের মাথার মুকুটকে নিয়ে যাওয়া হয় সপ্তম আসমানে। সপ্তম আসমানে তার সাাৎ হয় হযরত ইব্রাহীম খলিলুল্লাহ্ আলায়হিস্ সালাম-এর সঙ্গে। পরস্পর মোবারকবাদ জানান।
হরত ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালাম-এর সঙ্গে সাাতের পর তার অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকে। তিনি গিয়ে উপস্থিত হন সিদরাতুল মুনতাহার নিকট। এখানে জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম যাত্রা বিরতি করেন। হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম-এর পে আর সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হলো না। ইমামুল হারামাইন, ইমামুল কেবলাতাইন নবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম একাই সামনে এেিগয় যাচ্ছেন। অতঃপর বিশ্বের মহা গৌরব, চির আকাক্সিত মহানমানব নবী দোহাজাহানের মহাসম্মানিত সম্রাট, তাজদারে মদিনা, রাসূলুস্ সাকাইলাইন, পবিত্র ক্বোরআনের বাহক, বিশ্বজাহানেরর মুক্তির দিশারী, সরকারে মদিনায়ে মুনাওয়ারা, সরদারে মক্কায়ে মুকাররামা, শাহে বনি আদম, সরওয়ারে কায়িনাত, নবীকুল শিরোমণি, রাহমাতুল্লিল আলামীন, খাতামুন্নাবিয়ীন সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম নীত হলেন, অনাদি, অনন্ত, অবিনশ্বর, অসীম শক্তি সামর্থ্য ও হিকমতের মালিক আল্লাহ্ সুবাহানাহু তা’আলার একান্ত সান্নিধ্যে। একপাশে বিশ্ব জাহানের চিরআরাধ্য, চির উপাস্য, অদ্বিতীয় স্রষ্টা প্রতিপালক, অন্যপাশে তাঁর একান্ত প্রিয়ভাজন সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ও প্রিয়তম নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম অনুষ্ঠিত হলো স্রষ্টা ও সৃষ্টির অভূতপূর্ব সাাৎকার, অশ্র“তপূর্ব মহামিলন। অনন্ত প্রতাপান্বিত স্রষ্টা এবং মনোনীত প্রিয়তম সৃষ্টির মধ্যে হলো অমিয় বাণী বিনিময়। তোহফা স্বরূপ উম্মাতে মুহাম্মদীর জন্য বরাদ্ধ করা হলো পঞ্চাশ ওয়াক্ত ফরয নামায। এরপর শুরু হলো নবীজী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মর্ত্যলোকে ফিরে আসার পালা। এক পর্যায়ে সাাৎ হযরত মূসা আলায়হিস্ সালাম-এর সঙ্গে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কী কী তোহফা দেওয়া হয়েছে। উত্তরে শাহান শাহে রিসালাত সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বললেন, পঞ্চাশ ওয়াক্ত ফরয নামাযের কথা। উত্তরে মূসা আলায়হিস্ সালাম বলেন, আপনার উম্মতের পে সম্ভব হবে না পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায আদায় করা। আপনি ফিরে গিয়ে আপনার উম্মতের ওপর আরোপিত ও গুরদায়িত্ব হালকা করে নেয়ার জন্য আল্লাহর দরবারে আবেদন পেশ করুন। সুতরাং হুযূর-ই আকরাম আল্লাহর দরবারে ফিরে গিয়ে নামাযের সংখ্যা কমানোর জন্য আবেদন জানালেন। কয়েকবার যাতায়াতের পর অবশেষে পাঁচ ওয়াক্ত নামায নির্ধারিত হল।
হযরত মূসা আলায়হিস্ সালাম আরো কমানোর জন্য ফরিয়াদ করলে, উত্তরে শফীয়ে ইয়াওমুন নুশুর সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এ ব্যাপারটি নিয়ে আল্লাহ তা’আলার দরবারে পুনরায় যেতে আমি খুবই লাজ্জাবোধ করছি। অত্যন্ত সন্তুষ্টির সঙ্গে দিন ও রাতের মধ্যে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের সিদ্ধান্ত আমি মেনে নিলাম এ বলে নবীয়ে রহমাত সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সামনে এগিয়ে চললেন। এরপর ঘোষণা এলো ‘‘আমি আমার বান্দাদের জন্য ফরয জারি করে দিলাম এবং বান্দাদের দায়িত্ব ভার কিছুটা হালকা করে দিলাম।’’
মিরাজ সফরকালে তাকে যা দেখানো হয়েছিলো
মুস্তাফা জানে রহমতকে মি’রাজে সফরকালে বা দেখানো হয়েছিলো, তার কয়েকটি পাঠকদের খেদমতে তুলে ধরা হলো। ১. তাঁর সামনে দুধ ও মদ পেশ করা হয়েছিলো। তিনি দুধ পছন্দ করেছিলেন। এতে তাঁকে বলা হয়েছিলো, আপনাকে ফতরাতের (ইসলামের) পথ দেখানো হয়েছে, অথবা আপনি ফিতরাত প্রাপ্ত হয়েছেন। আপনি যদি মদ গ্রহণ করতে তাহলে আপনার উম্মত পথভ্রষ্ট হয়ে যেত। ২. জান্নাতের চারটি নদী। এর মধ্যে দুটো প্রকাশ্য এবং দুটো গোপন । ৩. তিনি জাহান্নামের দারোগাকে দেখেছেন। ৪. জান্নাত ও জাহান্নাম। তিনি জান্নাত ও জাহান্নাম দেখেছিলেন। ৫. অন্যায়ভাবে ইয়াতীমের মাল আত্মসাৎকারীদের অবস্থা। তাদের ঠোঁটের আকার-আকৃতি উটের ঠোঁটের আকার-আকৃতি উটের ন্যায়। তারা পাথরে টুকরোর ন্যায় আগুনের অংগার মুখের মধ্যে পড়ছিল এবং সেগুলো গুহ্যদ্বার দিয়ে নির্গত হয়ে আসছিল। ৬. সুদ খোরদের অবস্থা তাদের পেটগুলো এতই প্রকাণ্ড আকারের ছিলো যে, পেটের ভার বহন করতে তাদের জন্য খুবই কষ্টকর ব্যাপার। পেটের ভারে এদিক-ওদিক নড়াচড়া করা তাদের পে কোন ক্রমেই সম্ভব হচ্ছিল না। তাছাড়া ফেরাউনের বংশধরগণকে যখন অগ্নিকুণ্ডে নিেেপর জন্য পেশকরা হচ্ছিল তখন তারা এদেরকে পদদলিত করে অতিক্রম করছিল। ৭. ব্যভিচারীদের অবস্থা তাদের সামনে টাটকা গোশত ছিল এবং তারপাশে দুর্গন্ধযুক্ত পচা গোশত ছিলো। এরা টাটকা গোশত বাদ গিয়ে পচা গোশত খাচ্ছিল। ৮. সেই সকল স্ত্রী লোক। যারা স্বামীদেরকে অন্যের ঔরসজাত সন্তান প্রদান করে। অর্থাৎ, তারা ছিলো ব্যভিচারিনী। ব্যভিচারের কারণে তারা পর-পুরুষের দ্বারা গর্ভধারণ করত, কিন্তু অজান্তে সে সন্তান স্বামীর ঘাড়ে চাপিয়ে দিত। তিনি দেখলেন তাদের কঠিন শাস্তি দেয়া হচ্ছে।

